ক্রিকেট খেলা অলিম্পিকে না হওয়ার কারণ কী?

ক্রিকেট খেলার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা আসলে খুবই কম, এবং আমার মনে হয় খেলাটাকে ভারতীয় উপমহাদেশে অতিমূল্যায়িত করা হয়েছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ক্রিকেট মানে ঝিঁঝিঁপোকা। যেই অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, সেই অস্ট্রেলিয়াতেই জনপ্রিয়তার দিক থেকে ক্রিকেটের অবস্থান রাগবি এবং ফুটবলেরও নিচে। এখন ইংল্যান্ডে ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলছে, অথচ ইংলিশ সংবাদমাধ্যমগুলোতেও বিশ্বকাপ নিয়ে ততোখানি উত্তাপ নেই যতোটা আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোতে আছে।
 
বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা কম হওয়ার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্যই খেলাটার লম্বা দৈর্ঘ্য। আদিকালে ক্রিকেট খেলাটা হতো টাইমলেস টেস্ট ফর্ম্যাটে, অর্থাৎ জয়-পরাজয়ের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত খেলাটা অনন্তকাল ধরেও চালানো যেতো। সবচেয়ে বড় ‘টাইমলেস’ টেস্ট হয় ১৯৩৯ সালে ডারবানে ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে, যেই টেস্ট ১০ দিন ধরে খেলার পরেও কোনো ফলাফল আসেনি। একাদশ দিনে ইংল্যান্ডের জিততে ৫ উইকেটে মাত্র ৪২ রান দরকার ছিলো, কিন্তু জাহাজ ধরার তাড়ায় খেলা অসমাপ্ত রেখেই ইংল্যান্ড দলকে বাড়ি ফিরতে হয়। এরপর ৫ দিনের টেস্ট এসেছে, কিন্তু তাতেও অনেক ক্ষেত্রেই জয়-পরাজয় অমীমাংসিত থেকে যায়। তারপর যথাক্রমে ওয়ানডে আর টি-২০ আসলো, কিন্তু একটা টি-২০ ম্যাচ খেলতেও ৪/৫ ঘণ্টা সময় লাগে, যেটা অন্য যেকোনো খেলার তুলনায়ই বেশি। টুর্নামেন্টের দৈর্ঘ্য যদি বিবেচনা করা হয় – ২০১৬ রিও অলিম্পিক ১৭ দিনেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো, অথচ এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপের দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মাস।
 
আরেকটা কারণ হচ্ছে ক্রিকেট খেলাটা অনেক ব্যয়বহুল। ক্রিকেটটা ঠিক সর্বজনীন না, ক্রিকেটের উদ্ভাবকেরাই Gentleman’s Game ট্যাগের আড়ালে খেলাটাকে সাধারণ জনতার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। অলিম্পিকে যেসব খেলা হয় তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আপনি সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণ দেখতে পারবেন, কিন্তু ক্রিকেটে বিত্তবান পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলেমেয়েদেরই বেশি দেখা যায়। একজন গরিব পরিবারের ছেলের পক্ষে ক্রিকেটের নানারকম সরঞ্জাম কিনে অনুশীলন করাটা খুবই কঠিন। একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করতেও অন্য খেলার তুলনায় অনেক বেশি খরচ হয়। অলিম্পিকের এতোগুলো দেশের এতোরকম খেলার আয়োজন মাত্র একটা শহরেই করা হয়, অন্যদিকে প্রথম তিনটি আসর বাদে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সবগুলো আসরই হয়েছে একাধিক দেশে।
 
ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কম হওয়ার সবচেয়ে বড় দায় বিশ্বক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা আইসিসিরই। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে দলের সংখ্যা কখনোই কমেনি, বরং বেড়েছে – বর্তমানে ৩২ দল নিয়ে খেলা হয় এবং ফিফা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে সংখ্যাটাকে বাড়িয়ে ৪৮ করার, সারা বিশ্বে ফুটবলকে আরো বেশি ছড়িয়ে দিতে। সেখানে আইসিসি হাঁটছে উল্টো পথে, প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কথা বলে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। বিগ থ্রি, দ্বিস্তরী টেস্ট – এরকম নানা ধরনের ষড়যন্ত্রই করা হয়েছে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া দেশগুলোর মধ্যেও ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ কমানোর জন্য। টেস্ট স্ট্যাটাস নামের কৌলীন্যপ্রথাটাই নতুন ক্রিকেট খেলতে আসা যেকোনো দেশের জন্য হতাশাজনক। এসব কারণেই ক্রিকেট কখনো সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি, এবং এজন্যই অদূর বা সুদূর কোনো ভবিষ্যতেই ক্রিকেটকে অলিম্পিকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য।
 

তবে অলিম্পিকে ক্রিকেট যে কখনোই হয়নি তাও নয়। একবারই হয়েছিলো ১৯০০ সালে, যেখানে শুধু গ্রেট ব্রিটেন আর ফ্রান্স অংশ নিয়েছিলো এবং দুইদিনের ম্যাচে ফ্রান্সকে ১৫৮ রানে হারিয়ে গ্রেট ব্রিটেন স্বর্ণপদক জিতেছিলো।
ফুটনোটগুলি

[1] Playing time (cricket) – Wikipedia
[2] Cricket at the 1900 Summer Olympics – Wikipedia

Livereportbd

Latest growing bangla news portal titled Livereportbd offers to know Sports, Entertainment, Education, Lifestyle, National, World, etc.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *