বাংলাদেশের ছাত্ররা বিদেশে গিয়ে অনেক ভালো করে কেন?

আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে লেখাপড়া করতে যায়, অধিকাংশই স্নাতকোত্তর লেখাপড়া করে এবং পশ্চিমা দেশগুলোয় যায়। আমি নিজে কানাডায় স্নাতকোত্তর পড়ালেখা করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে উত্তর দিচ্ছি। বিদেশে আমাদের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ভালো করার প্রধান কারণ হলো বিদেশে গেলে বাধ্য হয়ে দায়িত্বশীল ও স্বাবলম্বী হতে হয়। এর ফলে লেখাপড়ায় অবহেলা করা থামে। অন্যভাবে বলতে গেলে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় ভালো করার মতো পরিবেশ থাকে। এই পরিবেশে পড়ে আমাদের দেশ থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করতে পারে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর জন্য বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে লেখাপড়া ভালো পরিবেশ দিচ্ছে সেটা বুঝতে হলে প্রথমে তাদের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির একটা বিশেষ দিকে ভালো করে বুঝতে হবে। দায়িত্বশীলতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। পশ্চিমা দেশগুলার জীবনযাত্রা প্রণালির দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন সতেরো-আঠারো বছর বয়স থেকেই গড়পড়তা একজন ব্যক্তিকে অনেক দায়িত্বশীল হতে হয়। বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার একটা চাপ থাকে। যাদের বাবা-মায়ের অনেক সম্পদ আছে তাদের কথা আলাদা। কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সবার বাস্তবতাই প্রায় এরকম। বিরাট বিপদে না পড়লে বাবা-মা সরাসরি আর্থিক সাহায্য করে না। অনেকেই নিজে কাজ করে ঘরের ভাড়া দেয়, নিজের দৈনন্দিন জীবনের খরচ মেটায়। বেশিরভাগ উন্নত দেশেই সরকার থেকে আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকে। কানাডায় ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ঋণের পরিমাণ এমন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মেটানোর পর নিজের চলার জন্য সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, সেখানে ছাত্রছাত্রীরা কম আর্থিক চাপে থাকে। কিন্তু সেখানেও বয়ঃপ্রাপ্তির পর থেকে অনেক দায়িত্ব নিতে হয়। আর দায়িত্ব বলতে শুধু আর্থিক দিকটাই না, এর সামাজিক দিকও আছে। এই বয়সের একজন ব্যক্তির বিভিন্নরকম সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বাবলম্বী হবে বলেই মনে করা হয়। বন্ধুত্ব বা প্রেমের জন্য নিজেকেই গায়ের তেল পুড়িয়ে মানুষ খুঁজে বের করতে হয়। কে কার সাথে বন্ধুত্ব বা প্রেম করল কেউ তাতে মাথা ঘামায় না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি। প্রেম তো তাও স্বাভাবিক ব্যাপার; কেউ যদি চায় সারাদিন মদপান আর মাদক সেবন করবে, তাহলেও কেউ উপদেশ দিতে আসে না, “এসব করলে ক্ষতি হবে।” শুধু পুলিশ কোনোভাবে খবর পেলে এসে গ্রেফতার করবে। কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেয় লেখাপড়া করবে না, বরং আজগুবি কোনো স্বপ্নের পিছে দৌড়ে জীবন পার করবে, তাহলেও কেউ সাবধান করতে আসে না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সমাজে ধরে নেওয়া হয় যে একজন ব্যক্তি যা করছে তা জেনে-শুনেই করছে, নিজের কর্মফল সে ভোগ করবে জেনেই করছে। কাজেই তাকে উপদেশ দিতে যাওয়া অর্থহীন। বিশ বছরের আগেই একজন মানুষের কাছ থেকে অনেক দায়িত্বশীলতা আশা করা হয় -এই কথাটা বুঝিয়ে বলতেই এত প্যাঁচাল পাড়লাম।

এর সাথে তুলনা করেন আমাদের দেশে সতেরো-আঠারো থেকে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর পর্যন্ত একজন মানুষের জীবন। বাবা-মায়ের উপর আর্থিক এবং সামাজিক দিক থেকে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। আমাদের তরুণেরাও কিন্তু নিজেদের দায়িত্ব নিতে সক্ষম। কিন্তু তাদেরকে দায়িত্ব নেওয়ার পরিবেশই তো দিচ্ছে না আমাদের সমাজ। জোর করে “ছোট বাবু” বানিয়ে রেখে দিচ্ছে প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণ-তরুণীদেরকে। দায়িত্বশীলতা যেহেতু শেখানো হয় না, তাই তারা দায়িত্বহীনতাটাই শিখে। নিজেরা নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না, নানারকমভাবে মূল্যবান সময় অপচয় হতে থাকে। যে কোন অজুহাতে “আন্দোলন” করে পরীক্ষা পেছানো হয়। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আর শিক্ষাদানে। সেই সাথে নিম্ন মানের শিক্ষক, শিক্ষা পদ্ধতি এবং পাঠ্যক্রম তো আছেই। এসব মিলে লেখাপড়ায় ভালো না করতে পারার জন্য খুব উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মজার ব্যপার হলো, শিক্ষার্থীরা যেহেতু এর চেয়ে ভালো কিছু এখনও দেখার সুযোগ পায়নি, তারা এটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।

এই শিক্ষার্থীরাই একদিন কোনোভাবে দেশে লেখাপড়া শেষ করে বিদেশে যায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে লেখাপড়া করতে। সেখানে গিয়ে একটা ধাক্কা খায়। যেসব সমাজে ব্যক্তির কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য আশা করা হয়, স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যপ্রণালি, শিক্ষাদানের সংস্কৃতি ইত্যাদির মধ্যেও তার প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তো শিক্ষার্থীদেরকে পুরোদস্তুর প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ হিসেবেই মনে করা হয়। তোমার ঘর ভাড়া, রান্না, কাপড় ধোয়া, প্রেম, বন্ধুত্ব, রোগ, শোক, আনন্দ, বিনোদন, কাজ, বিশ্রাম সবই তোমার দায়িত্ব। ও! আর লেখাপড়াও তোমারই দায়িত্ব। কারণ যথেষ্ট ভালো করে লেখাপড়া না করলে বৃত্তি বা ভর্তি বাতিল হতে পারে, পরের সেমিস্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ পাওয়া দুষ্কর হতে পারে, খুব কপাল খারাপ হলে ভিসাও বাতিল হতে পারে। দেশ থেকে আসা “ছোট বাবু” তখন পরিপার্শ্বের প্রভাবে চটপট “বড় হয়ে” নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দায়িত্বশীল মানুষ নিজের কাজ ভালো করাটাই স্বাভাবিক। তাই দেশ থেকে আসা বড় হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের অনেক খবর শোনা যায়।

যারা বিদেশে এসে এই “বড় হওয়া”টা করতে পারে সাধারণত তারাই পরে ভালো ফলাফল করে। অনেকেই কিন্তু এই ট্রান্সফর্মেশন বা রূপান্তরটা করতে পারে না। বিভিন্ন অজুহাতে কেউ দেশে ফিরে যায়। কেউ কোনোরকম পাস করে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে, শুধু “বিদেশে বসবাস” করার স্বপ্ন পূরণ করতে। যত সংবাদ শোনা যায় দেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে লেখাপড়ায় ভালো করার, তার সবই ওই বড় হয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়েদের কাজ। বাকিরাও কেউ কেউ বড় হয়, একটু ধীর গতিতে। যারা একেবারেই বড় হতে পারে না, তারা পিছে পড়ে যায়।

Livereportbd

Latest growing bangla news portal titled Livereportbd offers to know Sports, Entertainment, Education, Lifestyle, National, World, etc.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *